দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞান : মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা
● ভূমিকা
আদিম অরণ্যচারী মানুষ যেদিন প্রথম চকমকি পাথর ঘষে আগুন জ্বালতে শিখেছিল, সেদিনই অজান্তে সূচিত হয়েছিল বিজ্ঞানের জয়যাত্রা। আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমরা অনুভব করি যে, বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করাই অসম্ভব। আজ মানুষের প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি চিন্তা আর প্রতিটি কাজ বিজ্ঞানের জাদুদণ্ডে নিয়ন্ত্রিত। এই বিবর্তনের ধারায় বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে অজেয় শক্তি আর অপরিসীম স্বাচ্ছন্দ্য। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
"বিজ্ঞানের সাধনা মানুষের বুদ্ধি ও শক্তির সাধনা।"
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
● বিজ্ঞানের অর্থ ও ধারণা
বিজ্ঞান শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো 'বিশেষ জ্ঞান'। নিরন্তর পর্যবেক্ষণ, কঠোর পরীক্ষা-পরীক্ষা এবং অকাট্য যুক্তির ওপর ভিত্তি করে যে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাকেই আমরা বিজ্ঞান বলি। বিজ্ঞান কেবল কিছু জটিল সূত্র বা যন্ত্রের সমষ্টি নয়, এটি আসলে একটি জীবনদর্শন। এটি মানুষকে অন্ধকারের কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি দিয়ে যুক্তিবাদী হতে শেখায়। সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের কৌতূহলী মন যা কিছু আবিষ্কার করেছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো এই বিজ্ঞান।
● দৈনন্দিন জীবনে বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের চব্বিশ ঘণ্টার রুটিন বিজ্ঞানের দানে সমৃদ্ধ। অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে বৈদ্যুতিক আলো নেভানো পর্যন্ত আমরা পুরোপুরি বিজ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। রান্নাঘরের গ্যাস ওভেন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন যেমন আমাদের গৃহস্থালির শ্রম কমিয়ে দিয়েছে, তেমনি এসি বা হিটার আমাদের আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখিয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের সময় বাঁচিয়েছে এবং জীবনকে অনেক বেশি গতিশীল ও আরামদায়ক করে তুলেছে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যথার্থই বলেছিলেন—
"বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক জীবন এক মুহূর্তও চলতে পারে না।"
— জওহরলাল নেহরু
● কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞান
বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যের জোগান দিতে বিজ্ঞান কৃষিক্ষেত্রে এনেছে 'সবুজ বিপ্লব'। আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত মানের বীজ, শক্তিশালী কীটনাশক এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার ফলন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। লাঙলের জায়গায় আজ ট্রাক্টর আর হার্ভেস্টারের মতো যন্ত্রের ব্যবহারে কৃষকের শ্রম লাঘব হয়েছে। এমনকি জলসেচ ব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক পাম্প ও কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস কৃষিকে করেছে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও লাভজনক।
● চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান
চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি মানুষকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে এনেছে। একসময়ের মারণব্যাধি কলেরা, বসন্ত বা প্লেগ আজ বিজ্ঞানের দানে নির্মূল হয়েছে। এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই এবং কৃত্রিম অঙ্গ সংস্থাপনের মাধ্যমে মানুষের পরমায়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনকি মহামারীর প্রতিষেধক বা ক্যানসারের মতো কঠিন রোগের চিকিৎসাও আজ বিজ্ঞানের কল্যাণে হাতের নাগালে। আধুনিক শল্যচিকিৎসায় রোবটিক সার্জারি মানুষের নির্ভুল চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে।
● যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিজ্ঞান
বিজ্ঞান আজ বিশ্বকে একটি ক্ষুদ্র গ্রামে বা 'গ্লোবাল ভিলেজ'-এ পরিণত করেছে। যাতায়াত ব্যবস্থায় ট্রেন, বাস, জাহাজ কিংবা উড়োজাহাজ আসার ফলে দূরত্ব আজ জয় করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়েছে স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট। পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর আজ মুহূর্তের মধ্যে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে মানুষ আজ হাজার মাইল দূরে থেকেও একে অপরকে সশরীরে দেখার আনন্দ উপভোগ করছে।
● শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞান
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞানের ছোঁয়া শিক্ষার মানকে উন্নত করেছে। মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ ডিজিটাল ক্লাসরুম ও ই-লার্নিং-এ এসে পৌঁছেছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে ছাত্রছাত্রীরা আজ বাড়িতে বসেই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরিগুলো ব্যবহার করতে পারছে। প্রজেক্টরের মাধ্যমে দৃশ্য-শ্রাব্য পাঠদান পড়াশোনাকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তুলেছে। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ভাষায়—
"বিজ্ঞান হলো মানবতার জন্য এক চমৎকার উপহার, যা আমাদের নষ্ট করা উচিত নয়।"
— এপিজে আবদুল কালাম
● বিজ্ঞানের অপব্যবহার
বিজ্ঞানের আশীর্বাদের পাশাপাশি তার অভিশাপের দিকটিও উপেক্ষা করা যায় না। মানুষ যখন বিজ্ঞানের অসীম শক্তিকে ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করে, তখন নেমে আসে বিপর্যয়। পারমাণবিক বোমা, বিষাক্ত গ্যাস এবং মারণাস্ত্রের আবিষ্কার আজ মানবসভ্যতাকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া অতিরিক্ত মোবাইল ও ইন্টারনেটের নেশা নতুন প্রজন্মকে সমাজবিচ্ছিন্ন ও যান্ত্রিক করে তুলছে। বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণ আজ পৃথিবীর অস্তিত্বের সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে।
● বিজ্ঞানের উপকারিতা ও ক্ষতিকর দিক
বিজ্ঞানের ভালো বা মন্দ দিকটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের ওপর। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট আবিষ্কার করেছিলেন খনি শ্রমিকদের সুবিধার্থে, কিন্তু মানুষ তা ব্যবহার করল যুদ্ধের ধ্বংসলীলায়। বিজ্ঞান আমাদের ভৃত্য হতে পারে, কিন্তু তাকে প্রভু হতে দিলে বিপদ অনিবার্য। তাই বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সাথে সাথে আমাদের নৈতিকতা ও মানবিক বোধ জাগ্রত রাখা প্রয়োজন। বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এই সংকট দেখে সাবধান করেছিলেন—
"বিজ্ঞান একটি চমৎকার জিনিস, যদি না কাউকে এ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়।"
— অ্যালবার্ট আইনস্টাইন
● উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞান ও আধুনিক মানুষ আজ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে অস্বীকার করা মানে হলো অন্ধকারের যুগে ফিরে যাওয়া। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান যেন মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার না করে; বরং মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করে। বিজ্ঞানের অসীম শক্তির সাথে যদি শুভবুদ্ধি আর মানবিকতার মিলন ঘটে, তবেই এই বসুন্ধরা আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। বিজ্ঞানকে ধ্বংসের নয়, সৃষ্টির আলো হিসেবে গ্রহণ করাই হোক আমাদের সঙ্কল্প।
শিক্ষকের টিপস: মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রবন্ধের মান বাড়াতে এই উদ্ধৃতিগুলো নীল রঙের কালিতে এবং মূল লেখাটি কালো কালিতে লিখলে পরীক্ষকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হয়। প্রতিটি পয়েন্টের শিরোনাম যেন স্পষ্ট থাকে সেদিকে খেয়াল রাখবে।
Study Notes PDF
Download this article for offline study

Social Platforms