ভূমিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘ডাকঘর’ নাটকটি বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর ভাবব্যঞ্জক ও চিরন্তন সৃষ্টি যা পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের দ্বাদশ শ্রেণির চতুর্থ সেমিস্টারের পাঠ্যসূচির একটি অন্যতম স্তম্ভ। ১৯১১ সালে রচিত এই নাটকটি বাহ্যিক আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও এর অভ্যন্তরীণ দার্শনিক ব্যপ্তি অত্যন্ত বিশাল। নাটকটি এমন এক সময়ে রচিত হয়েছিল যখন রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক চেতনা এক বিশেষ রূপ পরিগ্রহ করছিল। ‘ডাকঘর’ কেবল একটি রুগ্ন বালকের গল্প নয়, বরং এটি মানুষের সীমাবদ্ধ অস্তিত্বের খাঁচা ভেঙে অসীমের পানে যাত্রার এক চিরকালীন আর্তি। অমল নামক এক অনাথ কিশোরের অবরুদ্ধ জীবন এবং জানালার বাইরে বয়ে চলা পৃথিবীর প্রতি তার অদম্য কৌতূহল এই নাটকের মূল চালিকাশক্তি। জীবনের সীমানা যেখানে মৃত্যুকে স্পর্শ করে, সেখানেই শুরু হয় এক নতুন অনন্ত যাত্রা—এই ধ্রুব সত্যই নাটকটিতে প্রকাশিত হয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য এই নাটকের গূঢ়ার্থ অনুধাবন করা কেবল পরীক্ষার জন্যই নয়, বরং জীবন দর্শনের পাঠ হিসেবেও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নাট্যকার পরিচিতি
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে গতানুগতিক নাট্যধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন। তাঁর নাট্যজীবনকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে তিনি দৃশ্যকাব্যের সীমানা পেরিয়ে শ্রুতিকাব্য ও রূপক-প্রতীকী নাটকের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের নাট্যচিন্তায় কেবল সামাজিক সমস্যা বা ঐতিহাসিক ঘটনা প্রাধান্য পায়নি, বরং মানুষের আত্মার মুক্তি এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানবহৃদয়ের নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। ‘ডাকঘর’ নাটকটি তাঁর প্রতীকী নাটকগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত যেখানে তিনি স্থবিরতা ও গতির দ্বন্দ্বকে শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে নাটকের সার্থকতা বাহ্যিক আড়ম্বরে নয়, বরং সংলাপের ব্যঞ্জনা ও চিন্তার গভীরতায়। তাঁর অন্যান্য কালজয়ী নাটক যেমন ‘রক্তকরবী’, ‘মুক্তধারা’, ‘অচলায়তন’ বা ‘রাজা’—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি প্রথাগত অভিনয় পদ্ধতির বদলে এক ধরণের প্রতীকী উপস্থাপনা চেয়েছিলেন। ‘ডাকঘর’ নাটকটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হওয়ার অন্যতম কারণ এর সর্বজনীন আবেদন। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে এই নাটক অভিনীত হয়ে মানুষকে অন্তহীন মানসিক সাহস জুগিয়েছিল।
নাটকের বিষয় ও প্রেক্ষাপট
‘ডাকঘর’ নাটকের বিষয়বস্তু আবর্তিত হয়েছে অমল নামক এক কিশোরকে কেন্দ্র করে যার শারীরিক অসুস্থতা তাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। নাটকের প্রেক্ষাপটটি গড়ে উঠেছে মাধব দত্তের বাড়ির একটি কক্ষের জানালা সংলগ্ন স্থানে। অমল অনাথ এবং মাধব দত্তের পালিত পুত্র হলেও তার মনটি কোনো জাগতিক বাঁধন বা সাবধানতার শৃঙ্খল মানতে চায় না। মাধব দত্ত ও কবিরাজের চরিত্র দুটি এখানে স্থিতাবস্থা ও শাস্ত্রীয় অনুশাসনের প্রতীক যারা অমলকে সুরক্ষিত রাখতে গিয়ে তাকে মূলত এক অদৃশ্য কারাগারে বন্দি করে রেখেছেন। জানালার বাইরে দিয়ে চলে যাওয়া দইওয়ালা, প্রহরী, ছোট মেয়ে সুধা এবং দাদামশায়ের ছদ্মবেশে রাজকীয় কোনো দূতের আগমন—সবই অমলের নিঃসঙ্গ জীবনে নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। গ্রামের নতুন তৈরি হওয়া ‘ডাকঘর’ অমলের কাছে এক মায়াবী আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। সে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে স্বয়ং ‘রাজা’ তাকে চিঠি পাঠাবেন এবং তাকে এক নতুন জগতের সন্ধান দেবেন। এই সাধারণ পটভূমির আড়ালে রবীন্দ্রনাথ আসলে সমকালীন ভারতবর্ষের স্থবির সমাজব্যবস্থা এবং সেই শৃঙ্খল ভাঙার এক প্রতীকী লড়াইকে তুলে ধরেছেন যেখানে মানুষের কল্পনাশক্তিই একমাত্র মুক্তির পথ।
নাটকের থিম বিশ্লেষণ
ডাকঘর নাটকের প্রধানতম থিম হলো মুক্তি বা স্বাধীনতার চিরন্তন স্পৃহা। অমল এখানে সেই মানবাত্মার প্রতীক যা জড়তা ও অভ্যাসের প্রাচীর ভেঙে অবারিত বিশ্বের সঙ্গে লীন হতে চায়। মুক্তির এই থিমটি নাটকে জানালার রূপকে প্রকাশ পেয়েছে যা একই সঙ্গে বন্দিত্ব ও মুক্তির মাধ্যম। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ থিম হলো মৃত্যুর প্রকৃত রূপায়ন। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে মৃত্যু মানে বিনাশ নয়, বরং মৃত্যু হলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণ। অমলের ঘুমিয়ে পড়া প্রকৃতপক্ষে জাগতিক যন্ত্রণার অবসান ও রাজকীয় মুক্তির আনন্দ। জীবন ও মরণের এই সন্ধিক্ষণকেই কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পরবর্তী থিম হলো শিশুমনের অপাপবিদ্ধ কৌতূহল ও কল্পনাপ্রবণতা। অমল তার কল্পনায় পাঁচমুড়োর পাহাড় পার হয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় যা বাস্তববাদী মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া মানবিকতার থিমটি এখানে অত্যন্ত প্রবল। দইওয়ালা বা প্রহরীর মতো সাধারণ মানুষের সঙ্গে অমলের সখ্যতা প্রমাণ করে যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সরলতা সব ধরণের সামাজিক বিভেদ মুছে দিতে পারে। সব শেষে পরমাত্মার সঙ্গে মিলনের থিমটি রাজার চিঠির প্রতীক্ষায় মূর্ত হয়েছে যেখানে ভক্তের আর্তি ও ভগবানের সাড়া একাকার হয়ে যায়।
গুরুত্বপূর্ণ শব্দার্থ
| শব্দ | অর্থ | নাটকে ব্যবহার |
| অমল | যা মলিন নয় বা কলুষহীন | নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র, যে শুদ্ধ ও পবিত্র আত্মার প্রতীক। |
| ডাকঘর | পত্র আদানপ্রদান কেন্দ্র | অজানার সংবাদ বা আধ্যাত্মিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত। |
| পাঁচমুড়োর পাহাড় | কাল্পনিক এক পাহাড়ের নাম | অমলের চোখে সুদূর অজানার হাতছানি ও মুক্তির সীমানা। |
| রাজার চিঠি | রাজকীয় বার্তা | পরম সত্য বা মুক্তির আহ্বান যা অমলের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা। |
| কবিরাজ | প্রাচীন চিকিৎসক | সমাজের অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রীয় শৃঙ্খলের প্রতিনিধি। |
| হরকরা | বার্তাবাহক বা রানার | সত্যের বাণী বহনকারী বা রাজার আগমনের সংকেতদাতা। |
| সুধা | পবিত্র পানীয় বা অমৃত | নাটকে অমলের জন্য অপেক্ষারত এক বালিকার চরিত্র। |
| অষ্টপ্রহর | সারা দিনরাত বা চব্বিশ ঘণ্টা | অমলের ঘরে বন্দি থাকার সময়ের দীর্ঘতা বোঝাতে ব্যবহৃত। |
| মাধব দত্ত | অমলের পালক পিতা | জাগতিক মায়া ও অতি-সতর্কতার এক সাধারণ মানবচরিত্র। |
| চণ্ডীপাঠ | শাস্ত্র পাঠ | ধর্মীয় অনুশাসন বা প্রথাগত শিক্ষার প্রতীক। |
নাট্যরূপ ও কাব্যিক বৈশিষ্ট্য
নাট্যরূপ বিচারে ‘ডাকঘর’ একটি ধ্রুপদী রূপক-প্রতীকী নাটক। এর আঙ্গিক ও গঠনশৈলী প্রথাগত নাটকের তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম ও ইঙ্গিতবহ। নাটকের সংলাপগুলো অত্যন্ত ছোট, সহজ এবং কৃত্রিমতাহীন হলেও তার অন্তরালে এক গভীর গীতিধর্মিতা লুকানো থাকে। রবীন্দ্রনাথ এখানে গদ্যের চলনে এমন এক সুর যুক্ত করেছেন যা নাটকটিকে একটি দীর্ঘ কবিতায় রূপান্তরিত করেছে। নাটকের প্রতিটি দৃশ্যই একেকটি স্বতন্ত্র ইমেজের সৃষ্টি করে যা দর্শকের মনে স্থায়ী রেখাপাত করে। প্রতীকধর্মিতা এই নাটকের প্রাণ—অমলের রোগশয্যা হলো জাগতিক বাধা, রাজার ডাকঘর হলো সত্যের আলয় এবং খোলা জানালা হলো অসীমের দুয়ার। রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনো প্রকার বাহ্যিক উত্তেজনাকর সংঘাত ব্যবহার করেননি, বরং অন্তরের ব্যাকুলতাকেই নাট্যক্রিয়ায় পরিণত করেছেন। ভাষাশৈলী ও অলংকারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবিরাজ ও মাধব দত্তের ভাষা যেখানে রূঢ় ও প্রথাগত, অমলের ভাষা সেখানে অত্যন্ত স্নিগ্ধ ও কল্পনাপ্রবণ। এই বিপরীতধর্মী ভাষার ব্যবহার নাটকের কাব্যিক গুণকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিরহ ও মিলনের এক অপার্থিব সুর পুরো নাটকটিকে নিয়ন্ত্রণ করে যা রবীন্দ্র-নাট্যশৈলীর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
উপসংহার
সামগ্রিক বিচারে ‘ডাকঘর’ নাটকটি কেবল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিই নয়, বরং এটি বিশ্বসাহিত্যের এক চিরকালীন সম্পদ। অমলের চরিত্রের মধ্য দিয়ে কবি এই ধ্রুব সত্যটিই প্রতিষ্ঠা করেছেন যে মানুষের দেহ রোগগ্রস্ত বা বন্দি হতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে কোনো জাগতিক নিয়ম দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। নাটকের শেষে যখন অমল চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়, তখন প্রকৃতপক্ষে তার চেতনার এক নতুন জন্ম ঘটে। বর্তমান যান্ত্রিক ও রুদ্ধশ্বাস যুগেও অমলের এই ব্যাকুলতা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে একইভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের শিক্ষার্থীদের জন্য এই নোটটি কেবল পাঠ্য বিষয় নয়, বরং জীবন দর্শনের গভীরে প্রবেশ করার একটি সহায়ক আলোকবর্তিকা। পরীক্ষার খাতায় এই তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণধর্মী উপস্থাপনা নাটকের প্রতিটি দিককে স্পর্শ করে শিক্ষার্থীদের উচ্চ নম্বর অর্জনে নিশ্চিতভাবে সহায়তা করবে।
পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার জন্য একজন শিক্ষকের পরামর্শ হিসেবে এই দুটি টিপস মাথায় রেখো:
১. রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার: উত্তর লেখার সময় 'অমল', 'ডাকঘর' বা 'রাজার চিঠি'—এই শব্দগুলোকে কেবল নাটকের অংশ হিসেবে না দেখে এগুলোর আধ্যাত্মিক ও রূপক অর্থ (যেমন: অমল হলো মুক্ত আত্মা, ডাকঘর হলো অজানার আহ্বান) স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করো।
২. নাট্যগুণ ও সমাপ্তি: এটি যে প্রথাগত দ্বন্দ্বমূলক নাটক নয় বরং একটি গীতিধর্মী ও ভাবপ্রধান নাটক, তা উল্লেখ করবে এবং নাটকের শেষে অমলের মৃত্যুকে দুঃখের হিসেবে না দেখিয়ে 'চিরমুক্তি' হিসেবে ফুটিয়ে তুলবে।
ব্যাস, এই দুটি পয়েন্ট উত্তরের গভীরে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই তোমার খাতা অন্যদের থেকে আলাদা হবে।
*সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শীঘ্রই আপলোড করা হবে।
Study Notes PDF
Download this article for offline study

Social Platforms