Bigyan Bonam Kusanskar


বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কার : মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা 

ভূমিকা

সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে মানুষের জয়যাত্রার ইতিহাস আসলে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াইয়ের ইতিহাস। আজ একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন মহাকাশ জয় করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে, তখনো সমাজের গভীরে মারণব্যাধির মতো বাসা বেঁধে আছে কুসংস্কার। বিজ্ঞান হলো যুক্তিনির্ভর সত্যের আলোকবর্তিকা, আর কুসংস্কার হলো যুক্তিহীন অন্ধকারের এক মায়াজাল। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের মনের অবচেতনে এই দুই বিপরীত মেরুর দ্বন্দ্ব আজও বর্তমান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—

"অন্ধকারে আটকা পড়ে আছে যারা,

আলোর দিশা পাবে না তো তারা।"

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের সংজ্ঞার্থ

বিজ্ঞান ও কুসংস্কার—শব্দ দুটি একে অপরের বিপরীত। বিজ্ঞান শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো 'বিশেষ জ্ঞান'। যা পর্যবেক্ষণ, তথ্য-প্রমাণ, পরীক্ষা-নীরাক্ষা এবং অকাট্য যুক্তির কঠিন কষ্টিপাথরে যাচাই করা, তাই বিজ্ঞান। বিজ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, কেন এবং কীভাবে-র উত্তর খোঁজে। অন্যদিকে, কুসংস্কার হলো ভিত্তিহীন বিশ্বাস। যে বিশ্বাসের পেছনে কোনো যুক্তি নেই, প্রমাণ নেই, যা কেবল ভয় বা অন্ধ আনুগত্যের ওপর টিকে থাকে, তাকেই বলা হয় কুসংস্কার। বিজ্ঞান প্রগতির প্রতীক, আর কুসংস্কার হলো স্থবিরতার নামান্তর।

কুসংস্কারের উৎস ও মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট

মানুষের মনে কুসংস্কারের জন্ম একদিনে হয়নি। আদিম যুগে মানুষ যখন প্রকৃতির রুদ্র রূপ দেখে ভীত হতো, বজ্রপাত বা মহামারি কেন হয় তা বুঝতে পারত না, তখনই সে এক অদৃশ্য অলৌকিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। এই ভয় ও অসহায়তা থেকেই গড়ে ওঠে নানা আজব বিশ্বাস। বংশপরম্পরায় এই বিশ্বাসগুলো আমাদের মস্তিষ্কে গেঁথে দেওয়া হয়। অশিক্ষা, দারিদ্র্য এবং এক শ্রেণির কায়েমি স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রচার এই কুসংস্কারের জালকে আরও বিস্তার করেছে। বর্তমান যুগে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি ঘটলেও মানুষের মজ্জাগত আদিম ভয়গুলো কাটেনি, যার সুযোগ নেয় ভণ্ড তান্ত্রিক বা অলৌকিকত্বের ব্যবসায়ীরা।

দৈনন্দিন জীবনের লৌকিক কুসংস্কার

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কুসংস্কার মিশে আছে। পথে চলার সময় কালো বিড়াল রাস্তা কাটলে অশুভ মনে করা, বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় পিছু ডাকলে থমকে যাওয়া, হাঁচি পড়লে যাত্রাপথকে কণ্টকাকীর্ণ মনে করা—এই সবই হলো মানসিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। অনেক শিক্ষিত পরিবারেও শুভ কাজে যাওয়ার সময় মাছ বা দই দর্শন করার প্রথা লক্ষ করা যায়। যদিও এই লৌকিক কুসংস্কারগুলি সরাসরি ক্ষতিকর নয়, কিন্তু এগুলি মানুষের আত্মবিশ্বাসকে খর্ব করে এবং যুক্তিহীনতাকে প্রশ্রয় দেয়।

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা ও কুসংস্কারের বিলুপ্তি

ইতিহাস সাক্ষী আছে, বিজ্ঞানের প্রতিটি নতুন আবিষ্কার কুসংস্কারের দুর্গে আঘাত হেনেছে। একসময় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণকে রাহু-কেতুর গ্রাস বলে মনে করা হতো এবং মানুষ ভয়ে গৃহবন্দি হয়ে থাকত। জ্যোতির্বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করে দিয়েছে যে এগুলি মহাজাগতিক ছায়ার খেলা মাত্র। আগে বসন্ত বা কলেরার মতো অসুখকে 'দেবীর অভিশাপ' মনে করা হতো। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান ভাইরাসের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে এবং টিকার মাধ্যমে সেই মৃত্যুকে রুখে দিয়েছে। বিজ্ঞানের আলো যত তীব্র হয়েছে, ডাইনি প্রথা বা নরবলির মতো মধ্যযুগীয় বীভৎস কুসংস্কারগুলো সমাজ থেকে ততটাই অপসৃত হয়েছে।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞান বনাম কুসংস্কারের লড়াই

কুসংস্কারের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব দেখা যায় স্বাস্থ্য পরিষেবায়। আজও ভারতের অনেক প্রত্যন্ত গ্রামে সাপে কাটলে মানুষ হাসপাতালে না গিয়ে ওঝা বা গুণিনের ওপর ভরসা করে, যার ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার প্রাণ অকালে ঝরে পড়ে। মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে 'ভূত ধরা' বা 'জিনে পাওয়া' বলে বিশ্বাস করা হয় এবং রোগীদের ওপর অমানুষিক শারীরিক অত্যাচার চালানো হয়। অথচ বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলে, এগুলি স্নায়বিক রোগ বা মস্তিষ্কের হরমোনের তারতম্য। বিজ্ঞানের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি যখন ক্যানসারকেও জয় করছে, সেখানে জলপড়া বা ঝাড়ফুঁক আসলে এক ধরণের সামাজিক ব্যাধি।

সামাজিক কুসংস্কার ও অবদমিত নারী সমাজ

আমাদের সমাজব্যবস্থায় আজও ডাইনি সন্দেহে বৃদ্ধাদের পিটিয়ে মারার খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। শিক্ষার অভাব ও সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে গ্রামীণ সমাজে নারীরাই এই কুসংস্কারের সহজ শিকারে পরিণত হন। এছাড়া কন্যা সন্তান জন্মের জন্য আজও অনেক জায়গায় জননীকে দায়ী করা হয়। অথচ ভ্রূণতত্ত্ব ও জেনেটিক্স বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য একমাত্র পিতার ওয়াই (Y) ক্রোমোজোমই দায়ী। কুসংস্কারের এই অন্ধকার দেয়ালগুলো আমাদের সমাজকে আজও অন্ধকারের গর্ভে আটকে রেখেছে।

ডিজিটাল কুসংস্কার: আধুনিকতার নতুন বিড়ম্বনা

বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, ইন্টারনেটের যুগে কুসংস্কার নিজের রূপ বদলেছে। এখন হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে ছড়ানো গুজব বা ভুয়ো তথ্যের মাধ্যমে নতুন ধরণের কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়ছে। রাশিফল বা জাদুকরী আংটি পরে ভাগ্য বদল করার বিজ্ঞাপন আজ ডিজিটাল মিডিয়ার বড় অংশ। মানুষ হাতে নামী ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন নিয়ে মহাকাশের খবর রাখছে ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণে আবার পাথর বা মাদুলির ওপর ভরসা রাখছে। এটি বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করে বিজ্ঞানমনস্কতাকে অস্বীকার করার এক নগ্ন রূপ।

কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গঠনে বিজ্ঞানের আবশ্যিকতা

কুসংস্কার নির্মূল করতে হলে কেবল বিজ্ঞান পড়লে বা ল্যাবরেটরিতে কাজ করলেই চলবে না, প্রয়োজন 'বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি' (Scientific Temper) গড়ে তোলা। বিজ্ঞান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়, প্রমাণ খুঁজতে শেখায়। পন্ডিত জওহরলাল নেহরু স্বাধীন ভারতের নাগরিকদের মধ্যে এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। যুক্তিবাদী চিন্তা যখন মানুষের মজ্জায় মিশে যাবে, তখনই সমাজ থেকে কুসংস্কারের বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলা সম্ভব হবে।

ছাত্রসমাজের দায়িত্ব ও সচেতনতামূলক ভূমিকা

আগামী দিনের সমাজ গড়ার কারিগর হলো ছাত্রসমাজ। কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় বিজ্ঞানকে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি ছাত্রকে হতে হবে যুক্তিবাদী ও সমাজসচেতন। নিজেদের পরিবার থেকে কুসংস্কার দূর করার শপথ নিতে হবে। বিজ্ঞান মেলা, অলৌকিক ঘটনার পেছনে থাকা বৈজ্ঞানিক কারণগুলো হাতে-কলমে প্রদর্শনী এবং গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা শিবির করার মাধ্যমে ছাত্ররা এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনতে পারে। স্বামী বিবেকানন্দের চরণে প্রতিফলিত হয় সেই সাহসী মানসিকতা—

"কুসংস্কারমুক্ত মনই হলো মুক্তির প্রথম সোপান।"

— স্বামী বিবেকানন্দ

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, বিজ্ঞান ও কুসংস্কারের দ্বন্দ্ব আসলে প্রগতি ও স্থবিরতার লড়াই। বিজ্ঞান মানুষকে অন্ধকারের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলে আলোর দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু কুসংস্কারের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। একে উপড়ে ফেলতে হলে প্রয়োজন গণশিক্ষা এবং বিজ্ঞান আন্দোলনের প্রসার। বিজ্ঞান আমাদের আরাম দিতে পারে, কিন্তু তাকে ব্যবহারের শুভবুদ্ধি আমাদের নিজেদের তৈরি করতে হবে। বিজ্ঞানের জয় হোক, মানুষের যুক্তিবাদ জয়ী হোক—তবেই পৃথিবী বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। অন্ধকারের সমস্ত জাল ছিঁড়ে বিজ্ঞানের জয়পতাকা আকাশে উড়ুক, এটাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।


শিক্ষকের বিশেষ পরামর্শ: এই প্রবন্ধটি বড় করে লেখার মূল কারণ হলো ওয়েবসাইট পাঠকরা যাতে সম্পূর্ণ তথ্য এক জায়গায় পায়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় লেখার সময় তুমি তোমার প্রয়োজনমতো শব্দ কমিয়ে নিতে পারো, তবে এই পয়েন্টগুলো রাখলে ১০-এ ১০ পাওয়া নিশ্চিত।

Study Notes PDF

Download this article for offline study

SPN EDTECH
Updates Courses Notes eBooks Login