Paribesh Dushon o Tar Pratikar

পরিবেশ দূষণ ও তার প্রতিকার : মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা

● ভূমিকা

প্রকৃতি ও মানুষ একে অপরের পরিপূরক। আদিম কাল থেকে মানুষ এই প্রকৃতির কোলেই লালিত-পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ নিজের অজান্তেই তার পরম বন্ধু এই পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছে। আজ জল, মাটি, বাতাস—সবই দূষণের কবলে। পৃথিবীর এই ক্ষতবিশত রূপ দেখে মনে পড়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই চিরন্তন হাহাকার—

"দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর।" — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

● পরিবেশ দূষণ কী ও বর্তমান পরিস্থিতি

পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য যখন কোনো বাহ্যিক ক্ষতিকারক উপাদানের প্রভাবে নষ্ট হয় এবং তার ফলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিকুলের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে, তাকেই বলে পরিবেশ দূষণ। বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ কেবল একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক সংকট। বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করছেন যে, আমরা যদি এখনই আমাদের জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তন না করি, তবে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর জয়যাত্রার অন্তরালে পরিবেশের এই মৃত্যুঘণ্টা আজ বিশ্ববাসীর কাছে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।

● বায়ু দূষণ: কারণ ও ভয়াবহ ফলাফল

পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান ও ভয়াবহ রূপ হলো বায়ু দূষণ। নগরায়ণের ফলে গাছপালা কেটে বড় বড় অট্টালিকা তৈরি হচ্ছে, যার ফলে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কলকারখানার কালো ধোঁয়া, যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস (কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড), এসি বা ফ্রিজ থেকে নির্গত সিএফসি (CFC) গ্যাস বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরে ফাটল ধরাচ্ছে। এর ফলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে এসে ত্বকের ক্যানসার ও চোখের রোগ সৃষ্টি করছে। এছাড়া বাতাসে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM 2.5) আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে শ্বাসকষ্ট ও দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিসের জন্ম দিচ্ছে।

● জল দূষণ: জীবনের উৎসে বিষ

'জলই জীবন'—এই প্রবাদটি আজ অর্থহীন হতে চলেছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে নদী ও সমুদ্রের জল আজ বিষাক্ত। কলকারখানার পারদ, সিসা ও ক্যাডমিয়াম যুক্ত বর্জ্য পদার্থ সরাসরি জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাসায়নিক সার ও ডিডিটি-র মতো বিষাক্ত কীটনাশক বৃষ্টির জলে ধুয়ে নদী ও পুকুরের জলে মিশছে। এর ফলে পানীয় জলের অভাবে টাইফয়েড, জন্ডিস ও কলেরার মতো রোগ মহামারী আকার নিচ্ছে এবং জলজ প্রাণিকুল ধ্বংসের মুখে পড়ছে। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর সেই বিখ্যাত উপলব্ধি আজ সংকটের মুখে—

"প্রকৃতির রহস্য উদ্ঘাটন করার চেয়ে প্রকৃতিকে রক্ষা করা অনেক বেশি জরুরি।" — আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

● শব্দ দূষণ: এক অদৃশ্য যন্ত্রণা

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার এক ভয়াবহ উপজাত হলো শব্দ দূষণ। উৎসবের মরশুমে মাইকের বিকট আওয়াজ, কলকারখানার শব্দ, যানবাহনের হর্ন এবং উচ্চ মাত্রার আতশবাজি মানুষের স্নায়বিক বৈকল্য ঘটাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নির্দিষ্ট মাত্রার অধিক শব্দ মানুষের হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং শ্রবণশক্তি হ্রাসের কারণ হতে পারে। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হওয়া এবং অনিদ্রা রোগ এই শব্দ দূষণেরই কুফল। উপযুক্ত আইন থাকলেও জনগণের অসচেতনতা এই সমস্যাকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে।

● মৃত্তিকা ও প্লাস্টিক দূষণ: অন্নদাতার সংকট

মাটি হলো আমাদের অন্নদাতা। কিন্তু আধুনিক মানুষ মাটির উর্বরতা নষ্ট করতেও দ্বিধাবোধ করছে না। প্লাস্টিক ও পলিথিন হলো মৃত্তিকা দূষণের প্রধান কারিগর। প্লাস্টিক অভঙ্গুর পদার্থ হওয়ায় তা শত শত বছর মাটিতে পড়ে থাকলেও পচে যায় না, ফলে মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয় এবং গাছপালার বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য নর্দমার মুখ বন্ধ করে কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি করে। জমিতে ব্যবহৃত অতিরিক্ত রাসায়নিক সার মাটির গঠন নষ্ট করে খাদ্যশৃঙ্খলে বিষ প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে।

● বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন

পরিবেশ দূষণের এক চরম ফল হলো বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং। বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে এবং সমুদ্রের জলস্তর বাড়ছে। অদূর ভবিষ্যতে মালদ্বীপ বা সুন্দরবনের মতো নিচু এলাকাগুলো জলের নিচে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রকৃতির এই খামখেয়ালি আচরণ—কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও ভয়াবহ খরা—সবই আমাদের পরিবেশের ওপর অত্যাচারের ফল।

● পরিবেশ রক্ষায় ছাত্রসমাজের ভূমিকা

ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে পরিবেশ রক্ষায় ছাত্রসমাজের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে পরিবেশ সচেতন হয়ে উঠতে হবে। প্লাস্টিক বর্জন, নিজের জন্মদিনে অন্তত একটি চারাগাছ লাগানো এবং কাগজ বা বিদ্যুতের অপচয় রোধ করার মতো ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতামূলক মিছিল এবং সাধারণ মানুষকে দূষণের কুফল সম্পর্কে অবগত করার কাজ ছাত্ররাই সবচেয়ে নিপুণভাবে করতে পারে। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন—

"জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।" — স্বামী বিবেকানন্দ

● দূষণ রোধের উপায় ও কার্যকর প্রতিকার

পরিবেশকে বাঁচাতে হলে আমাদের এখনই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নামতে হবে। প্রতিকারের মূল পথগুলো হলো: ১. বনায়ন: 'একটি গাছ একটি প্রাণ'—এই মন্ত্রকে সামনে রেখে প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। ২. বিকল্প শক্তি: কয়লা বা পেট্রোলের বদলে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জোয়ার-ভাটা শক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। ৩. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: বর্জ্য পদার্থ পুনর্ব্যবহার বা ‘রিসাইক্লিং’ পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। ৪. আইন প্রণয়ন: দূষণকারী শিল্পসংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর আইন ও জরিমানা ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. জনসচেতনতা: প্লাস্টিক বর্জন এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রার ওপর জোর দিতে হবে।

● উপসংহার

পৃথিবী আমাদের মা, আর এই মা-কে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই। আমরা যদি আজ সজাগ না হই, তবে আগামী প্রজন্ম এক মৃতপ্রায় পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সাথে সাথে আমাদের শুভবুদ্ধির উদয় হতে হবে। পরিবেশ বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ। এপিজে আবদুল কালামের ভাষায়—

"পরিবেশ রক্ষা করা কেবল সরকারের কাজ নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।" — এপিজে আবদুল কালাম


শিক্ষকের বিশেষ পরামর্শ: এই প্রবন্ধটি বড় করে লেখার মূল কারণ হলো ওয়েবসাইট পাঠকরা যাতে সম্পূর্ণ তথ্য এক জায়গায় পায়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় লেখার সময় তুমি তোমার প্রয়োজনমতো শব্দ কমিয়ে নিতে পারো, তবে এই পয়েন্টগুলো রাখলে ১০-এ ১০ পাওয়া নিশ্চিত।

Study Notes PDF

Download this article for offline study

SPN EDTECH
Updates Courses Notes eBooks Login