বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য : মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা
● ভূমিকা
"রূপসী বাংলা" — কবি জীবনানন্দ দাশের এই অমোঘ সম্বোধনটি সার্থক হয়েছে বাংলার অনন্য ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে। বিশ্বের খুব কম দেশেই ঋতুর এমন স্পষ্ট এবং বৈচিত্র্যময় বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ঋতুচক্রের আবর্তনে বাংলার প্রকৃতি একেক সময় একেক সাজে আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়। দুই মাসের ব্যবধানে প্রকৃতির এই রূপবদল বাঙালি জীবন, সংস্কৃতি এবং মননকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ঋতুর এই পালাবদল যেন এক মহাকাব্যিক নাটক, যেখানে প্রকৃতিই হলো প্রধান চরিত্র। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
"ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্চিত ক্ষিতিসৌরভ রভসে।"
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
● ঋতুচক্রের আবর্তন ও ভৌগোলিক ধারণা
বাংলার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বারোটি মাস ছয়টি ঋতুতে বিভক্ত। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত—এই ছয়টি ঋতু পর্যায়ক্রমে এসে বাংলার মাটিকে শস্য-শ্যামলা ও প্রাণবন্ত করে তোলে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ঋতুগুলোর প্রভাব বাংলায় অত্যন্ত প্রবল। প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব রং, নিজস্ব শব্দ, নিজস্ব ফুল ও ফল রয়েছে। ঋতুচক্রের এই চক্রাকার গতি বাঙালির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ধর্মীয় উৎসবের প্রধান ভিত্তি।
● গ্রীষ্মের রুদ্ররূপ ও বৈশাখী তপ্ত বেলা
বাংলার ঋতুচক্রের জয়যাত্রা শুরু হয় গ্রীষ্মের হাত ধরে। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ—এই দুই মাস প্রচণ্ড দাবদাহে প্রকৃতি তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে। তপ্ত দুপুরে মাঠের মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যায়, চারদিকে শুধু এক খাঁ খাঁ হাহাকার। গাছের পাতা শুকিয়ে আসে, নদ-নদীর জল শুকিয়ে যায়। কিন্তু গ্রীষ্মের এই কঠোরতার আড়ালেই প্রকৃতি সাজিয়ে রাখে তার রসালো ফলের ঝুড়ি। আম, জাম, কাঁঠাল ও লিচুর মৌ মৌ গন্ধে ভরে ওঠে বাংলার প্রতিটি ঘর। আবার এই ঋতুতেই হঠাৎ গোধূলির আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা নিয়ে ধেয়ে আসে 'কালবৈশাখী', যা ধুলোবালি উড়িয়ে তপ্ত ধরণীকে শান্ত করে এক অদ্ভুত শীতলতা দান করে।
● বর্ষার সজল মেঘ ও প্লাবিত প্রাণশক্তি
গ্রীষ্মের প্রখর জ্বালা জুড়াতে আষাঢ় ও শ্রাবণের সজল মেঘ নিয়ে আসে বর্ষা। আকাশের বুক চিরে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে প্রকৃতি ফিরে পায় তার হারানো সজীবতা। শুষ্ক নদ-নদী, খাল-বিল কানায় কানায় ভরে ওঠে। কদম্ব, কেয়া ও জুঁই ফুলের গন্ধে বাংলার বাতাস ভারী হয়ে যায়। বর্ষা হলো বাঙালির রোমান্টিকতার ঋতু, বিরহের ঋতু। বর্ষার অঝোর ধারায় সিক্ত হয়ে চাষিরা যখন মাঠে লাঙল দেয়, তখন তা কেবল ফসলের গান নয়, বরং প্রাণের স্পন্দন হিসেবে প্রতিধ্বনিত হয়। কবি জয়দেবের ভাষায়—
"মেঘৈর্মেদুরমম্বরং বনভুবঃ শ্যামাস্তমালদ্রুমৈঃ"
— কবি জয়দেব
● শরতের স্নিগ্ধতা ও নীল আকাশের হাতছানি
ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে বর্ষার বিদায়ের পর আসে বাঙালির সবথেকে প্রিয় এবং কাঙ্ক্ষিত ঋতু শরৎ। শরতের আকাশ যেন এক শিল্পী; ধবধবে সাদা মেঘের ভেলাগুলো নীল আকাশে ভেসে বেড়ায়। নদীতীরে সাদা কাশফুলের দোলা আর শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধে বাংলার বুক ভরে ওঠে। শরৎ মানেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব শারদীয়া দুর্গোৎসবের ঢাকিদের বাদ্যধ্বনি। প্রকৃতি তখন এক নির্মল, প্রসন্ন সাজে নিজেকে সাজিয়ে নেয়। ভোরে ঘাসের ডগায় প্রথম শিশিরের ছোঁয়া জানিয়ে দেয় যে ধরিত্রী আজ শান্ত এবং উৎসবমুখর।
● হেমন্তের মায়াবী কুয়াশা ও নবান্নের জয়গান
কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে আসে হেমন্ত। শরতের উজ্জ্বলতা আর শীতের রুক্ষতার মাঝখানের এই সন্ধিক্ষণটি বড়ই মায়াবী। বিকেলের রোদে তখন এক অলস মায়া জড়িয়ে থাকে। হেমন্ত মানেই সোনালী ধানের প্রাচুর্য। মাঠের পর মাঠ পাকা ধান যখন বাতাসে দোল খায়, তখন কৃষকের মুখে ফোটে সার্থকতা ও হাসির রেখা। নবান্নের নতুন চালের পিঠে-পুলির উৎসবে গ্রামবাংলা হয়ে ওঠে আনন্দমুখর। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের এক মৃদু ইশারা এই ঋতু থেকেই শুরু হয়।
● শীতের রিক্ততা ও উৎসবের ওম
পৌষ ও মাঘ মাসে বাংলার প্রকৃতিতে নামে শীতের গাম্ভীর্য। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় গাছের পাতা ঝরে যায়, প্রকৃতি হয় কিছুটা রিক্ত ও ধূসর। কিন্তু বাঙালির কাছে এই রিক্ততাও উৎসবের। খেজুর রসের মিষ্টি হাঁড়ি, নলেন গুড়ের সন্দেশ আর পৌষপার্বণের পিঠের আসর শীতকালকে এক অনন্য আভিজাত্য দান করে। শীত মানেই মেলা, সার্কাস, বনভোজন আর কমলালেবুর রোদ পোহানো আলস্যমাখা দুপুর। বাংলার শীত কেবল শীতলতা আনে না, আনে হরেক রকম টাটকা শাকসবজি আর মানুষের কাছাকাছি আসার উষ্ণতা।
● বসন্তের মাধুর্য ও ঋতুরাজের অভিষেক
ফাল্গুন ও চৈত্র মাসের হাত ধরে আসে প্রকৃতির রাজাধিরাজ বসন্ত। শীতের রুক্ষতা ঝেড়ে ফেলে প্রকৃতি তখন নতুনের আবাহনে মেতে ওঠে। নতুন কিশলয় ও পুষ্প মঞ্জরির মেলা বসে গাছের ডালে ডালে। কোকিলের কুহুতান আর শিমুল-পলাশ-অশোক ফুলের রক্তিম আভায় প্রকৃতি হয়ে ওঠে যৌবনোদীপ্ত। বসন্ত হলো রঙের ঋতু। দোলযাত্রা বা হোলির রঙে সারা বাংলা যখন রাঙিয়ে ওঠে, তখন মানুষে মানুষে বিভেদ ঘুচে গিয়ে এক পরম সম্প্রীতি তৈরি হয়। বসন্তের বিদায়ের মাধ্যমেই এক বছরের ঋতুচক্রের পূর্ণতা ঘটে।
● বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিতে ঋতুর প্রভাব
বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি বাঙালির জীবনবোধের অঙ্গ। আমাদের খাদ্যতালিকা থেকে শুরু করে পোশাক-আশাক, সবই ঋতুভেদে পরিবর্তিত হয়। বাংলার কবি-সাহিত্যিকরা ঋতুর এই লীলাখেলা দেখেই কালজয়ী সব সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘ঋতুরঙ্গ’ থেকে শুরু করে জীবনানন্দের ‘রূপসী বাংলা’—সবখানেই এই ঋতু পরিবর্তনের বন্দনা করা হয়েছে। ঋতুভেদে আমাদের মানসিকতাও পরিবর্তিত হয়—কখনো বর্ষার বিরহ, কখনো বসন্তের চঞ্চলতা আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে।
● উপসংহার
বাংলার এই ঋতুবৈচিত্র্য প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। তবে বর্তমান সময়ে বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং নির্বিচারে অরণ্য ধ্বংসের ফলে ঋতুচক্রের এই সুশৃঙ্খল ছন্দ আজ বিপন্ন। বর্ষার সময়ে বৃষ্টিহীনতা আবার শরৎকালে অসময়ে বন্যা—প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনা আমাদের জন্য এক অশনি সংকেত। বাংলার এই চিরকালীন রূপকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। যদি ঋতুরা তাদের আপন রূপ হারিয়ে ফেলে, তবে আমাদের সংস্কৃতি ও প্রাণশক্তিও ধূসর হয়ে যাবে। তাই আসুন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসি এবং বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে বাংলার এই ঋতুবৈচিত্র্যকে আগামী প্রজন্মের জন্য অমলিন রাখি।
শিক্ষকের বিশেষ পরামর্শ: এই প্রবন্ধটি বড় করে লেখার মূল কারণ হলো ওয়েবসাইট পাঠকরা যাতে সম্পূর্ণ তথ্য এক জায়গায় পায়। মাধ্যমিক পরীক্ষায় লেখার সময় তুমি তোমার প্রয়োজনমতো শব্দ কমিয়ে নিতে পারো, তবে এই পয়েন্টগুলো রাখলে ১০-এ ১০ পাওয়া নিশ্চিত।
Study Notes PDF
Download this article for offline study

Social Platforms