বাংলার উৎসব : মাধ্যমিক প্রবন্ধ রচনা
● ভূমিকা
"বারো মাসে তেরো পার্বণ"—এই প্রবাদেই বাঙালির উৎসবপ্রিয়তার পরিচয় মেলে। সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামলা এই বাংলা কেবল প্রকৃতির রূপেই নয়, বরং উৎসবের আনন্দধারাতেও চিরকাল সজীব। উৎসব হলো বাঙালির মিলনক্ষেত্র, যেখানে দৈনন্দিন জীবনের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে গিয়ে এক স্বর্গীয় আনন্দধারা প্রবাহিত হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়—
"মানুষের উৎসব কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যকে আনন্দ দেওয়ার মধ্যে দিয়েই তার সার্থকতা।"
— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
● বাংলার উৎসবের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য
বাংলার উৎসব কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমাহার নয়, এটি বাঙালির বেঁচে থাকার এক গভীর দর্শন। গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই উৎসবগুলোর মূল বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীনতা। এখানে ব্যক্তিগত আনন্দ সমষ্টিগত খুশিতে রূপান্তরিত হয়। ঋতুচক্রের আবর্তনের সাথে সাথে বাংলার উৎসবগুলোও তাদের রূপ বদলায়, যা বাঙালির সমাজ ও সংস্কৃতিকে এক অনন্য মর্যাদা প্রদান করেছে। স্বামী বিবেকানন্দের চরণে উৎসবের প্রাণস্পন্দন ধরা পড়ে—
"জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।"
— স্বামী বিবেকানন্দ
● বাংলার ধর্মীয় উৎসব
বাংলার ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হলো শারদীয়া দুর্গাপূজা। শরৎকালের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলায় যখন মা দুর্গার আগমন ঘটে, তখন আপামর বাঙালি মেতে ওঠে মহামিলনের উৎসবে। এছাড়াও দীপাবলির আলোয় সজ্জিত কালীপূজা, বিদ্যার দেবী সরস্বতী পূজা এবং ভ্রাতৃদ্বিতীয়া ও জামাইষষ্ঠীর মতো লৌকিক আচারের ধর্মীয় রূপ বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের জোয়ার আনে। ঈদ, মহরম, বড়দিন বা বুদ্ধপূর্ণিমা—সবই এদেশের মাটিতে ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে বাঙালির আপন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়—
"প্রীতিই মানুষের প্রধান ধর্ম এবং সেই প্রীতির পরম উৎস হলো উৎসব।"
— বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
● বাংলার লোকউৎসব ও গ্রামীণ উৎসব
বাংলার মাটির গন্ধ মিশে থাকে তার লোকউৎসবগুলোতে। অগ্রহায়ণের নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দই হলো 'নবান্ন', যা কৃষিজীবী বাঙালির এক অন্যতম প্রধান উৎসব। পৌষ মাসের পিঠে-পুলির উৎসব 'পৌষপার্বণ' আজও বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করে। অন্যদিকে চৈত্র সংক্রান্তির 'গাজন' ও 'চড়ক' মেলা গ্রামবাংলার এক আদিম সংস্কৃতির বাহক। বর্ষবরণের 'পহেলা বৈশাখ' বা বসন্তের 'দোল উৎসব' বাঙালির লোকায়ত জীবনে রঙের ছোঁয়া এনে দেয়, যেখানে মাটির সুর আর প্রাণের টান মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
● সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে উৎসবের ভূমিকা
সামাজিক সংহতি রক্ষায় বাংলার উৎসবের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উৎসবের দিনগুলোতে মানুষ তার সংকীর্ণ স্বার্থ ত্যাগ করে একে অপরের সাথে প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে উৎসবগুলো হয়ে ওঠে শিল্পকলা, সংগীত ও নাট্যচর্চার পীঠস্থান। নতুন পোশাক পরা, আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে যাওয়া এবং সকলে মিলে খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজজীবনে এক সজীবতার সঞ্চার ঘটে। এই মিলনই সমাজকে স্থবিরতা থেকে মুক্তি দিয়ে এক প্রগতিশীল রূপ প্রদান করে।
● বাংলার উৎসবে ঐক্য ও সম্প্রীতির প্রকাশ
বাংলার উৎসবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অসাম্প্রদায়িক চেতনা। "ধর্ম যার যার, উৎসব সবার"—এই আদর্শই বাংলার মাটিতে সত্য হয়ে ওঠে। দুর্গাপূজার মণ্ডপে যেমন মুসলিম ভাইদের উপস্থিতি দেখা যায়, তেমনি ঈদের খুশিতে শামিল হয় হিন্দু প্রতিবেশীও। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিই ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক। জওহরলাল নেহরু ভারতের এই ঐক্য নিয়ে বলেছিলেন—
"ভারতবর্ষ একটি বৈচিত্র্যময় দেশ এবং উৎসবগুলোই এই বৈচিত্র্যের মধ্যে একতার সুতো গেঁথে দেয়।"
— জওহরলাল নেহরু
● আধুনিক জীবনে বাংলার উৎসবের পরিবর্তন
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বাংলার উৎসবের বহিরঙ্গও বদলেছে। গ্রামীণ মেলার সেই আন্তরিকতা আজ বড় শহরের থিম পূজার চাকচিক্যে ঢাকা পড়েছে। আধুনিকতায় উৎসব অনেক বেশি যান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশ্বায়নের প্রভাবে বিদেশি সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটলেও বাঙালির আবেগ ও প্রাণের টান কিন্তু একই আছে। আলোকসজ্জা বা মাইকের আওয়াজ বাড়লেও মানুষের মনে উৎসবের সেই চিরন্তন আবেদন আজও অমলিন।
● বাংলার উৎসবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
বাংলার উৎসব কেবল আনন্দের নয়, এর একটি বিশাল অর্থনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কুটির শিল্প থেকে শুরু করে বড় বড় বাজার—সবই চাঙ্গা হয়ে ওঠে। মৃৎশিল্পী, তাঁতি, ঢাকী এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটিরুজি মূলত এই উৎসবগুলোর ওপরেই নির্ভরশীল। এছাড়াও উৎসবের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বিনিময় ঘটে, তা গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে প্রভূত সাহায্য করে।
● উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বাংলার উৎসব বাঙালির অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। উৎসবের এই পুণ্য ধারা বাঙালিকে শিখিয়েছে পরকে আপন করতে এবং দুঃখকে জয় করে আনন্দে বাঁচতে। যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে জীবন যখন ক্লান্তিহীন হয়ে ওঠে, তখন এই উৎসবগুলোই আমাদের সঞ্জীবনী সুধা দান করে। আমরা যেন উৎসবের বাহ্যিক জৌলুসের আড়ালে তার আসল সুর—মানুষে মানুষের প্রীতি ও সম্প্রীতিকে হারিয়ে না ফেলি। উৎসবের আলোয় আমাদের মনের কালিমা দূর হোক এবং প্রীতির বন্ধন চিরস্থায়ী হোক—এটাই আমাদের সঙ্কল্প হওয়া উচিত।
শিক্ষকের টিপস: মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে এই উদ্ধৃতিগুলো নীল কালিতে এবং মূল লেখাটি কালো কালিতে লিখবে। পয়েন্টগুলোর হেডিং যেন স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। শুভকামনা রইল!
Study Notes PDF
Download this article for offline study

Social Platforms