🟢 ১. মৌলিক তথ্য (Basic Info)
শুরুকথা: স্বামী বিবেকানন্দের ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী রচনা। এটি তৎকালীন আড়ষ্ট গদ্যের বিপরীতে চলিত ভাষার সপক্ষে এক বলিষ্ঠ ঘোষণা।
📖 অধ্যায়ের নাম: বাঙ্গালা ভাষা
✍️ লেখক: স্বামী বিবেকানন্দ
🏫 শ্রেণি: দ্বাদশ শ্রেণি (সেমিস্টার-3)
📌 উৎস: ‘ভাববার কথা’ নামক প্রবন্ধ গ্রন্থ
📁 সাহিত্যিক ধরণ: প্রবন্ধ
🟢 ২. লেখকের পরিচিতি (Author Introduction)
স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) ছিলেন আধুনিক ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গুরু এবং চিন্তাবিদ। তাঁর সাহিত্য রচনায় ফুটে উঠেছে নির্ভীকতা এবং তেজি ভাব। তিনি মূলত বাংলা ভাষার চলিত রূপের সমর্থক ছিলেন। তাঁর গদ্য শৈলীকে অনেক সময় 'বিবেকানন্দীয় গদ্য' বলা হয়, যা অত্যন্ত ওজস্বী এবং সজীব। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পরিব্রাজক’, ‘বর্তমান ভারত’, ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ এবং ‘ভাববার কথা’। তিনি ভাষাকে কেবল পন্ডিতদের সম্পদ হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের প্রাণের সম্পদ হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন।
🟢 ৩. সম্পূর্ণ সারাংশ (Full Summary)
‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ বাংলা ভাষার আদর্শ রূপ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতে, যে ভাষায় আমরা কথা বলি, সেই ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করা উচিত। তিনি তৎকালীন ‘সাধু ভাষা’ বা আড়ষ্ট ও সংস্কৃত শব্দবহুল ভাষাকে ‘মড়া ভাষা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
বিবেকানন্দ বিশ্বাস করতেন, ভাষাই হলো মনের ভাব প্রকাশের বাহন। যদি ভাষা অত্যন্ত জটিল হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, আরবি, ফারসি বা ইংরেজি শব্দ বাংলা ভাষায় মিশে গিয়ে ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাকে দুর্বল করেনি। তাঁর মতে, ভাষা যত সচল এবং প্রবহমান হবে, জাতির উন্নতি তত দ্রুত হবে। তিনি লেখকদের পরামর্শ দিয়েছেন যেন তাঁরা জনসাধারণের মুখের ভাষায় লেখেন, যাতে জ্ঞান ও শিক্ষা সকলের কাছে সহজলভ্য হয়। তিনি বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার প্রশংসা করলেও, সময়ের প্রয়োজনে আরও আধুনিক ও প্রাণবন্ত ভাষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন।
🟢 ৪. মূল ভাববস্তু (Theme / Central Idea)
এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো ভাষাগত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। পন্ডিতদের আভিজাত্য থেকে ভাষাকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করা। বিবেকানন্দের প্রধান বার্তা ছিল—ভাষার আভিজাত্যের চেয়ে তার কার্যকারিতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জীবন্ত ভাষা বা চলিত ভাষার মাধ্যমেই দেশের আপামর জনসাধারণের কাছে নবজাগরণের বার্তা পৌঁছানো সম্ভব। অকারণে বিদেশি শব্দ বর্জন না করে বরং সেগুলোকে আপন করে নেওয়ার মাধ্যমেই বাংলা ভাষার তেজ বৃদ্ধি পায়।
🟢 ৫. গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা (Important Explanation)
"ভাষা মানুষের জন্য, মানুষ ভাষার জন্য নয়।"
স্বামী বিবেকানন্দ বোঝাতে চেয়েছেন যে, ভাষার গুরুত্ব তার ব্যাকরণে বা জটিল শব্দে নয়, বরং তার মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছানোর ক্ষমতায়। ভাষা যদি মানুষের উপকারে না আসে তবে সেই ভাষার কোনো সার্থকতা নেই।
"তড়তড়িয়ে বেরুচ্ছে..."
বিবেকানন্দ ভাষার গতিশীলতার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, ভাষা যখন কলমের মুখ থেকে স্বাভাবিকভাবে বেরিয়ে আসে, তখনই তা প্রাণবন্ত হয়। কৃত্রিমভাবে সাজানো ভাষা পাঠকদের মনে রেখাপাত করে না।
🟢 ৬. প্রবন্ধের মূল যুক্তি (Key Arguments)
- মুখের ভাষা বনাম পুঁথির ভাষা: পুঁথির ভাষা অনেক সময় মানুষের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
- শব্দচয়ন: আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, যদি তা প্রচলিত হয়।
- শিক্ষার প্রসার: সাধারণ মানুষের ভাষায় শিক্ষা না দিলে দেশের উন্নতি সম্ভব নয়।
- প্রাকৃত জনের ভাষা: কলকাতা বা শান্তিপুরের মার্জিত ভাষার বাইরেও সাধারণ মানুষের ভাষার তেজ রয়েছে।
🟢 ৭. ভাষাশৈলী ও অলংকার (Style)
বিবেকানন্দের এই প্রবন্ধে কোনো কাব্যিক অলংকারের চেয়ে বড় হলো তাঁর ‘যুক্তি’ এবং ‘সরাসরি বক্তব্য’। তিনি রূপক হিসেবে ‘জীবন্ত’ এবং ‘মৃত’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন ভাষাকে বোঝাতে। তাঁর ভাষা অত্যন্ত পুরুষালি এবং জোরালো। একে অনেক সময় 'মিলিটারি গদ্য' হিসেবেও অভিহিত করা হয় কারণ তা সরাসরি লক্ষ্যে আঘাত করে এবং পাঠককে উজ্জীবিত করে।
🟢 ৮. বহু বিকল্প ভিত্তিক প্রশ্ন (MCQ Section)
- ১. ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি কোন গ্রন্থে আছে?
(ক) পরিব্রাজক (খ) ভাববার কথা (গ) বর্তমান ভারত (ঘ) প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য
উঃ (খ) ভাববার কথা - ২. স্বামী বিবেকানন্দের মতে ভাষার প্রধান কাজ কী?
(ক) পাণ্ডিত্য প্রদর্শন (খ) ব্যাকরণ মানা (গ) মনের ভাব প্রকাশ করা (ঘ) কঠিন শব্দ ব্যবহার
উঃ (গ) মনের ভাব প্রকাশ করা - ৩. বিবেকানন্দ কোন ভাষাকে ‘মড়া ভাষা’ বলেছেন?
(ক) ইংরেজি (খ) চলিত ভাষা (গ) অতিমাত্রায় সাধু ভাষা (ঘ) হিন্দি ভাষা
উঃ (গ) অতিমাত্রায় সাধু ভাষা - ৪. বাংলা ভাষায় কোন ধরণের শব্দের প্রবেশকে লেখক সমর্থন করেছেন?
(ক) কেবল সংস্কৃত (খ) কেবল তদ্ভব (গ) আরবি-ফারসি ও ইংরেজি (ঘ) কোনো বিদেশি শব্দ নয়
উঃ (গ) আরবি-ফারসি ও ইংরেজি - ৫. “ভাষা মানুষের জন্য, মানুষ ভাষার জন্য নয়” – এটি কার উক্তি?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (খ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (গ) স্বামী বিবেকানন্দ (ঘ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
উঃ (গ) স্বামী বিবেকানন্দ - ৬. প্রবন্ধের শেষে লেখক কোন ধরণের ভাষা চর্চার কথা বলেছেন?
(ক) গুরুগম্ভীর ভাষা (খ) সরল ও জীবন্ত ভাষা (গ) অতি আধুনিক ভাষা (ঘ) সংস্কৃত ঘেঁষা ভাষা
উঃ (খ) সরল ও জীবন্ত ভাষা - ৭. বিবেকানন্দের মতে কোন জায়গার ভাষা অধিক মার্জিত ও প্রচলিত?
(ক) দিল্লি ও আগ্রা (খ) কলকাতা ও ঢাকা (গ) কলকাতা ও শান্তিপুর (ঘ) নদিয়া ও হুগলি
উঃ (গ) কলকাতা ও শান্তিপুর - ৮. লেখক বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষার কী করেছেন?
(ক) সমালোচনা করেছেন (খ) নিন্দা করেছেন (গ) প্রশংসা করেছেন (ঘ) বর্জন করেছেন
উঃ (গ) প্রশংসা করেছেন - ৯. "যতক্ষণ না কলম দিয়ে মুখ দিয়ে তড়তড়িয়ে বেরুচ্ছে..." – এখানে ‘তড়তড়িয়ে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
(ক) দ্রুত কথা বলা (খ) স্বাভাবিক ও সাবলীল প্রকাশ (গ) চিৎকার করা (ঘ) তোতলামি করা
উঃ (খ) স্বাভাবিক ও সাবলীল প্রকাশ - ১০. ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি মূলত কাদের জন্য উপদেশমূলক?
(ক) শিশুদের (খ) তৎকালীন লেখক ও পন্ডিতদের (গ) বিদেশি বণিকদের (ঘ) কেবল শিক্ষার্থীদের
উঃ (খ) তৎকালীন লেখক ও পন্ডিতদের - ১১. স্বামী বিবেকানন্দের গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
(ক) নমনীয়তা (খ) ওজস্বিতা ও স্পষ্টতা (গ) জটিলতা (ঘ) অতি অলংকারিতা
উঃ (খ) ওজস্বিতা ও স্পষ্টতা - ১২. ‘প্রাকৃত’ শব্দের অর্থ বিবেকানন্দের প্রবন্ধে কী হিসেবে ব্যবহৃত?
(ক) প্রকৃতিজাত (খ) সাধারণ মানুষ বা জনসাধারণ (গ) প্রাচীন ভাষা (ঘ) অশিক্ষিত লোক
উঃ (খ) সাধারণ মানুষ বা জনসাধারণ - ১৩. "আরবি-ফারসি শব্দ বাঙ্গালা থেকে তাড়াবার জো নেই" – কেন?
(ক) রাজনৈতিক চাপে (খ) সেগুলো ভাষার সাথে মিশে গেছে (গ) ভয়ে (ঘ) নতুন শব্দের অভাবে
উঃ (খ) সেগুলো ভাষার সাথে মিশে গেছে - ১৪. সাহিত্যের প্রধান বাহন কোনটি হওয়া উচিত?
(ক) মৃত ভাষা (খ) পুঁথির ভাষা (গ) মুখের ভাষা (ঘ) সংকেত ভাষা
উঃ (গ) মুখের ভাষা - ১৫. স্বামী বিবেকানন্দ কত বছর বেঁচে ছিলেন?
(ক) ৫০ বছর (খ) ৩৯ বছর (গ) ৬০ বছর (ঘ) ৪২ বছর
উঃ (খ) ৩৯ বছর - ১৬. পন্ডিতদের ভাষা চর্চাকে লেখক কীসের সাথে তুলনা করেছেন?
(ক) সমুদ্র মন্থন (খ) আভিজাত্যের লড়াই (গ) পন্ডিতি অভিমান (ঘ) কোনোটিই নয়
উঃ (গ) পন্ডিতি অভিমান - ১৭. বিবেকানন্দের মতে দেশের উন্নতির চাবিকাঠি কী?
(ক) টাকা (খ) ইংরেজি শিক্ষা (গ) জনসাধারণের কাছে জ্ঞানের বিস্তার (ঘ) কঠোর আইন
উঃ (গ) জনসাধারণের কাছে জ্ঞানের বিস্তার - ১৮. ‘ভাববার কথা’ গ্রন্থটি কত সালে প্রকাশিত হয়?
(ক) ১৯০৫ (খ) ১৯০৭ (গ) ১৯১২ (ঘ) ১৯২০
উঃ (গ) ১৯১২ (মরণোত্তর সংকলন) - ১৯. লেখক ভাষার ক্ষেত্রে কোনটির বিরোধী ছিলেন?
(ক) নতুনত্ব (খ) আড়ষ্টতা ও কৃত্রিমতা (গ) সরলতা (ঘ) ভাবাবেগ
উঃ (খ) আড়ষ্টতা ও কৃত্রিমতা - ২০. স্বামী বিবেকানন্দ কোন দর্শনের প্রচারক ছিলেন?
(ক) দ্বৈতবাদ (খ) অদ্বৈত বেদান্ত (গ) জৈন ধর্ম (ঘ) বৌদ্ধ ধর্ম
উঃ (খ) অদ্বৈত বেদান্ত
🟢 ৯. এক নজরে রিভিশন (Quick Revision)
- ✅ ‘বাঙ্গালা ভাষা’ প্রবন্ধটি বিবেকানন্দের ‘ভাববার কথা’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে।
- ✅ লেখক আড়ষ্ট সাধু ভাষার পরিবর্তে গতিশীল চলিত ভাষার সপক্ষে মত দিয়েছেন।
- ✅ ভাষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো সহজভাবে মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করা।
- ✅ বিদেশি শব্দ বর্জন না করে সেগুলোকে ভাষার শক্তি হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
- ✅ জনসাধারণের মুখের ভাষাকেই সাহিত্যের প্রকৃত ভাষা বলে তিনি মনে করেন।
- ✅ শিক্ষার প্রসারের জন্য সরল ও সাবলীল ভাষা ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
Study Notes PDF
Download this article for offline study
Social Platforms