প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় (১৮৭৩–১৯৩২): বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পকার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদধন্য এই লেখক তাঁর সহজ-সরল এবং সরস রচনার জন্য পরিচিত।
বিখ্যাত কাজ: তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পের মধ্যে রয়েছে 'দেবী', 'আদরিনী', 'কাশীবাসিনী' ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাস 'রত্নদীপ' অত্যন্ত জনপ্রিয়।
লেখার ধরণ: তাঁর লেখনী অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং বাস্তবধর্মী। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের ছোট ছোট হাসি-কান্নাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। তাঁর গল্পে কোনো জটিল দার্শনিকতা নেই, বরং আছে হৃদস্পর্শী মানবিকতা।
'আদরিনী' গল্পটি একটি হাতি এবং তার মালিকের মধ্যকার গভীর ভালোবাসার কাহিনী। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়রাম মুখুজ্জে, যিনি একজন জমিদার ছিলেন না কিন্তু হাতি রাখার শখ ছিল। আদরিনী ছিল তাঁর সেই শখের হাতি।
গল্পের শুরুতে দেখা যায়, জয়রাম তাঁর নাতনির বিয়েতে আদরিনীকে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আদরিনী কেবল একটি পশু ছিল না, সে ছিল মুখুজ্জে পরিবারের একজন সদস্যের মতো। হাতিটির খরচ সামলাতে গিয়ে জয়রামকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হতো, এমনকি ঋণগ্রস্তও হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি আদরিনীকে বিক্রি করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতেন না।
গল্পের বাঁক বদলায় যখন জয়রামের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। পাওনাদারদের চাপে এবং সংসারের অভাবে তিনি বাধ্য হন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আদরিনীকে বিক্রি করতে। আদরিনীকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, সেই দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত করুণ। পশুর চোখেও জল দেখা গিয়েছিল।
গল্পের শেষে দেখা যায়, নতুন মালিকের কাছে আদরিনী মানিয়ে নিতে পারে না। সে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত জয়রাম যখন খবর পান, তিনি ছুটে যান তাঁর প্রিয় 'আদরিনী'র কাছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। হাতি এবং মানুষের এই অবুঝ কিন্তু গভীর প্রেমের বিয়োগান্তক সমাপ্তি পাঠককে অশ্রুসিক্ত করে।
প্রাণী ও মানুষের সম্পর্ক: এই গল্পের মূল বার্তা হলো—মমতা ও ভালোবাসা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি অবলা প্রাণীও মানুষের ভালোবাসা অনুভব করতে পারে এবং তার বিনিময়ে নিঃস্বার্থ ভক্তি ও প্রাণ বিসর্জন দিতে পারে।
আভিজাত্যের মোহ ও বাস্তবতা: জয়রাম মুখুজ্জের হাতি রাখার শখ ছিল তাঁর আভিজাত্যের প্রতীক। কিন্তু আর্থিক অনটন কীভাবে মানুষের শখ এবং আবেগকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়, লেখক এখানে তা নিপুণভাবে দেখিয়েছেন।
- আদরিনীর বিচ্ছেদ দৃশ্য: যখন আদরিনীকে বিক্রি করা হলো, সে মাহুতের নির্দেশ মানতে চাইছিল না। এটি প্রমাণ করে যে প্রাণীরা তাদের চিরচেনা পরিবেশ এবং মানুষকে কত গভীরভাবে চেনে।
- জয়রামের ঋণগ্রস্ততা: হাতির খাবার এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জয়রামের দেনা হওয়াটা দেখায় যে, তিনি যুক্তির চেয়ে আবেগকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
- বিয়োগান্তক পরিণতি: আদরিনীর মৃত্যু কেবল একটি পশুর মৃত্যু নয়, এটি ছিল জয়রামের শেষ সম্বল এবং আবেগের মৃত্যু।
১. জয়রাম মুখুজ্জে: গল্পের প্রধান মানব চরিত্র। তিনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং পশুবৎসল। আদরিনীকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আভিজাত্য বজায় রাখতে গিয়ে তিনি অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন।
২. আদরিনী (হাতি): গল্পের নামচরিত্র এবং মূক নায়ক। সে রাজকীয় মেজাজের হলেও জয়রামের প্রতি অনুগত ছিল। তার মৃত্যু প্রমাণ করে যে প্রাণীরাও অভিমানে প্রাণ ত্যাগ করতে পারে।
৩. জয়রামের স্ত্রী: তিনি বাস্তববাদী চরিত্র। হাতির জন্য সংসারের খরচ এবং ঋণ নিয়ে তিনি চিন্তিত থাকলেও স্বামীর আবেগকে সম্মান করতেন।
গল্পের নামকরণ সাধারণত চরিত্র, ঘটনা বা ভাবের ওপর ভিত্তি করে হয়। এখানে 'আদরিনী' নামটি একই সাথে একটি হাতির নাম এবং গল্পের কেন্দ্রীয় সুরের প্রতীক।
- ব্যঞ্জনধর্মিতা: হাতিটির নাম 'আদরিনী' রাখা থেকেই বোঝা যায় জয়রামের কাছে সে কতটা আদরের ছিল।
- করুণ রস: গল্পের শেষে আদরিনীর মৃত্যু করুণ রসের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছে।
- শিল্পগুণ: লেখকের নির্মেদ ভাষা এবং হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই নামকরণটি সব দিক থেকে সার্থক ও সার্থক।
- 'আদরিনী' গল্পের লেখক কে?
(ক) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (খ) প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় (গ) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ঘ) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
উঃ (খ) প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় - আদরিনী আসলে কে?
(ক) জয়রামের নাতনি (খ) একটি কুকুর (গ) একটি হাতি (ঘ) জয়রামের মেয়ে
উঃ (গ) একটি হাতি - জয়রাম মুখুজ্জের শখ কী ছিল?
(ক) বাগান করা (খ) ঘোড়া কেনা (গ) হাতি রাখা (ঘ) শিকার করা
উঃ (গ) হাতি রাখা - জয়রাম কেন আদরিনীকে বিক্রি করতে বাধ্য হন?
(ক) রাগের মাথায় (খ) হাতির স্বভাব খারাপ হওয়ায় (গ) ঋণের দায়ে (ঘ) হাতিটি বুড়ো হয়ে যাওয়ায়
উঃ (গ) ঋণের দায়ে - আদরিনী কার বাড়িতে বিয়ের কাজে গিয়েছিল?
(ক) জয়রামের ছেলের (খ) জয়রামের নাতনির (গ) জমিদারের (ঘ) মাহুতের বাড়িতে
উঃ (খ) জয়রামের নাতনির - ৬. জয়রাম মুখুজ্জের বাসস্থানের নাম কী ছিল?
(ক) শান্তিনিকেতন (খ) রামপুর (গ) রসুলপুর (ঘ) শোনপুর
উঃ (গ) রসুলপুর - ৭. আদরিনীকে কেনার সময় জয়রামের অবস্থা কেমন ছিল?
(ক) তিনি অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন (খ) তিনি তখন সচ্ছল অবস্থায় ছিলেন (গ) তিনি ভিখারি ছিলেন (ঘ) তিনি তখন সন্ন্যাসী ছিলেন
উঃ (খ) তিনি তখন সচ্ছল অবস্থায় ছিলেন - ৮. আদরিনীকে দেখাশোনা করার জন্য নিযুক্ত ব্যক্তিকে কী বলা হতো?
(ক) রাখাল (খ) সারথি (গ) মাহুত (ঘ) মাঝি
উঃ (গ) মাহুত - ৯. নাতনির বিয়েতে আদরিনীকে কোথায় পাঠানো হয়েছিল?
(ক) কলকাতা (খ) পাটনা (গ) কৃষ্ণনগর (ঘ) অন্য গ্রামে বরের বাড়িতে
উঃ (ঘ) অন্য গ্রামে বরের বাড়িতে - ১০. আদরিনীকে বিক্রি করার প্রস্তাব প্রথম কে দিয়েছিল?
(ক) জয়রামের নাতনি (খ) জয়রামের গিন্নি (স্ত্রী) (গ) পাওনাদাররা (ঘ) গ্রামবাসী
উঃ (খ) জয়রামের গিন্নি (স্ত্রী) - ১১. গল্পের শেষে আদরিনীর মৃত্যু কীভাবে হয়?
(ক) বার্ধক্যজনিত কারণে (খ) দুর্ঘটনায় (গ) অভিমানে ও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে (ঘ) অন্য হাতির সাথে লড়াইয়ে
উঃ (গ) অভিমানে ও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে - ১২. জয়রাম মুখুজ্জের চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য কোনটি?
(ক) কঠোরতা (খ) স্বার্থপরতা (গ) পশুপ্রেম (ঘ) কৃপণতা
উঃ (গ) পশুপ্রেম - ১৩. "সে যেন আমার পরিবারেরই একজন"—এখানে 'সে' কে?
(ক) জয়রামের নাতনি (খ) আদরিনী (গ) মাহুত (ঘ) জয়রামের বন্ধু
উঃ (খ) আদরিনী - ১৪. আদরিনীকে কত টাকায় বিক্রি করার কথা হয়েছিল?
(ক) ৫০০ টাকা (খ) ৮০০ টাকা (গ) ১২০০ টাকা (ঘ) ১৫০০ টাকা
উঃ (খ) ৮০০ টাকা (গল্পের তথ্য অনুযায়ী এটি পরিবর্তিত হতে পারে, তবে গল্পের মূল পাঠ অনুযায়ী সঠিক অঙ্কটি পরীক্ষা করে নিও) - ১৫. প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের লেখনীর বিশেষত্ব কী?
(ক) জটিল দর্শন (খ) সহজ-সরল ও মরমী ভাষা (গ) অতিপ্রাকৃত ঘটনা (ঘ) রাজনৈতিক বিদ্রূপ
উঃ (খ) সহজ-সরল ও মরমী ভাষা - ১৬. আদরিনীকে যখন বিক্রি করা হয়, তখন আকাশের অবস্থা কেমন ছিল?
(ক) প্রখর রোদ (খ) মেঘলা ও বৃষ্টির আবহাওয়া (গ) ঝোড়ো হাওয়া (ঘ) পূর্ণিমার রাত
উঃ (খ) মেঘলা ও বৃষ্টির আবহাওয়া - ১৭. জয়রাম আদরিনীকে কী বলে ডাকতেন?
(ক) গজরাজ (খ) হাতি মা (গ) আদরিনী (ঘ) ময়না
উঃ (গ) আদরিনী - ১৮. আদরিনীর মৃতদেহ কোথায় পড়ে ছিল?
(ক) জয়রামের বাড়ির উঠোনে (খ) নতুন মালিকের আস্তাবলে (গ) নদীর ধারে (ঘ) গভীর জঙ্গলে
উঃ (খ) নতুন মালিকের আস্তাবলে - ১৯. এই গল্পটি মূলত কোন সময়ের সমাজব্যবস্থাকে তুলে ধরে?
(ক) আধুনিক যুগ (খ) ব্রিটিশ আমলের ক্ষয়িষ্ণু জমিদারী প্রথা ও শখের যুগ (গ) বৈদিক যুগ (ঘ) মোগল আমল
উঃ (খ) ব্রিটিশ আমলের ক্ষয়িষ্ণু জমিদারী প্রথা ও শখের যুগ - ২০. গল্পের শেষ অনুভূতিটি কেমন?
(ক) হাস্যরসাত্মক (খ) বীরত্বব্যঞ্জক (গ) অত্যন্ত করুণ ও বিয়োগান্তক (ঘ) রোমাঞ্চকর
উঃ (গ) অত্যন্ত করুণ ও বিয়োগান্তক
- গল্পের সারমর্ম: মানুষ ও পশুর নিঃস্বার্থ প্রেমের কাহিনী।
- প্রধান চরিত্র: জয়রাম মুখুজ্জে ও তার হাতি আদরিনী।
- প্রধান দ্বন্দ্ব: শখ বনাম দারিদ্র্য।
- ক্লাইম্যাক্স: পাওনাদারদের চাপে আদরিনীকে বিক্রি করে দেওয়া।
- উপসংহার: বিরহে এবং অভিমানে আদরিনীর করুণ মৃত্যু।
- মূল শিক্ষা: ভালোবাসা কোনো ভাষা বা জাতিভেদ মানে না।
✦ সংক্ষিপ্ত পুনরালোচনা: গল্পের প্রতিটি স্তরেই প্রেম, ত্যাগ ও করুণার ছাপ স্পষ্ট।
Study Notes PDF
Download this article for offline study
Social Platforms