🟢 ১. মৌলিক তথ্য (Basic Info Section)
বাংলা সাহিত্যের যুগপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের এক অনন্য সৃষ্টি হলো ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি। এটি কেবল একটি বিড়াল ও মানুষের কথোপকথন নয়, বরং সমাজের গভীর বৈষম্যের প্রতি এক তীক্ষ্ণ শ্লেষ।
- 📖 প্রবন্ধের নাম: বিড়াল
- ✍️ লেখক: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- 📚 মূল গ্রন্থ: কমলাকান্তের দপ্তর (১৮৭৫)
- 🏫 শ্রেণি: একাদশ (সেম-১)
- 📌 ধরণ: রম্যরচনা / রূপকধর্মী সামাজিক প্রবন্ধ
🟢 ২. লেখক পরিচিতি (Author Introduction)
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪): বাংলা সাহিত্যের 'সাহিত্য সম্রাট' হিসেবে পরিচিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা উপন্যাসের জনক। তিনি ছিলেন একাধারে সরকারি কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক।
বিখ্যাত কাজ: তাঁর প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’। এছাড়া ‘আনন্দমঠ’, ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘বিষবৃক্ষ’ এবং ‘দেবী চৌধুরানী’ তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি। তাঁর রচিত 'বন্দে মাতরম' গানটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে স্বীকৃত।
লেখার শৈলী: বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে যুক্তিবাদ, দেশপ্রেম এবং হাস্যরসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ পাওয়া যায়। 'বিড়াল' প্রবন্ধে তিনি হাস্যরসের আড়ালে সমাজতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
🟢 ৩. গল্পের পূর্ণ সারাংশ (Full Summary)
‘বিড়াল’ প্রবন্ধটির সূচনা হয় কমলাকান্ত নামক এক আফিমখোর চরিত্রের মাধ্যমে। কমলাকান্ত আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে ওয়াটারলুর যুদ্ধ নিয়ে ভাবছিলেন। এমন সময় একটি বিড়াল এসে কমলাকান্তের জন্য রাখা দুধটুকু খেয়ে ফেলে। প্রথমে কমলাকান্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বিড়ালটিকে মারতে লাঠি উঁচিয়ে ধরেন।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় গল্পের মূল চমৎকারিত্ব। বিড়ালটি (যার নাম মার্জার) মানুষের ভাষায় কমলাকান্তের সাথে তর্কে লিপ্ত হয়। বিড়ালটি যুক্তি দেখায় যে—পৃথিবীর সমস্ত খাবারের ওপর সবার সমান অধিকার। সে প্রশ্ন তোলে, কেন একজন ধনী ব্যক্তি অঢেল খাবার নষ্ট করবে অথচ একটি ক্ষুধার্ত বিড়াল একটু দুধ খেলে তাকে চোর অপবাদ দেওয়া হবে?
বিড়ালের মতে, অধর্ম চোরের নয়, বরং অধর্ম সেই কৃপণ ধনীর, যে ক্ষুধার্তের অন্ন কেড়ে নেয়। বিড়ালটি চোর এবং বিচারকের সম্পর্কের এক নগ্ন সত্য তুলে ধরে। পরিশেষে, কমলাকান্ত বিড়ালের যুক্তির কাছে পরাজিত বোধ করেন এবং বুঝতে পারেন যে এই 'মার্জার-তত্ত্ব' আসলে সমাজের বঞ্চিত মানুষেরই হাহাকার।
🟢 ৪. মূল ভাববস্তু (Theme / Central Idea)
‘বিড়াল’ প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো তৎকালীন ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থার মুখোশ খুলে দেওয়া। বঙ্কিমচন্দ্র এখানে সাম্যবাদ ও মানবতাবাদের জয়গান গেয়েছেন।
- সামাজিক বৈষম্য: ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিদ্যমান আকাশচুম্বী ব্যবধানকে লেখক এখানে বিড়ালের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন।
- সাম্যবাদ: কার্ল মার্কসের সাম্যবাদী তত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়ার আগেই বঙ্কিমচন্দ্র বিড়ালের মুখ দিয়ে বলিয়েছেন—"ক্ষুধার্তের অন্নসংস্থান করা সমাজের কর্তব্য।"
- বিদ্রূপ: তথাকথিত বিচারব্যবস্থা এবং বড়লোকদের ভণ্ডামিকে বিদ্রূপ করা হয়েছে।
🟢 ৫. গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা ও পয়েন্ট (Important Explanation)
১. "চোর যে চুরি করে, সে কি সাধ করিয়া করে?": বিড়ালের এই প্রশ্নটি সমাজের মূল শিকড়ে আঘাত করে। অভাবই মানুষকে চোর বানায়। সমাজ যদি সবার অন্নের ব্যবস্থা করত, তবে চুরির প্রয়োজন হতো না।
২. "আমি চোর বটে, কিন্তু তুমি কি?": বিড়াল কমলাকান্তকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, যারা অন্যের ধন আত্মসাৎ করে বড়লোক হয়েছে, তারাও এক প্রকার বড় চোর। কিন্তু তারা বিচারকের আসনে বসে ছোট চোরকে দণ্ড দেয়।
৩. কমলাকান্তের দ্বিধা: কমলাকান্ত প্রথমে বিড়ালকে মারতে চাইলেও পরে তার যুক্তিতে মুগ্ধ হন। এটি লেখকের নিজের মনের দ্বন্দ্বের প্রতিফলন।
পরীক্ষার জন্য টিপস: বিড়ালের দার্শনিক উক্তিগুলো (যেমন: "তৈলযুক্ত মাথায় তৈল দেওয়া মনুষ্যজাতির স্বভাব") ভালো করে মুখস্থ রাখা জরুরি।
🟢 ৬. চরিত্র বিশ্লেষণ (Character Sketch)
১. কমলাকান্ত: গল্পের কথক। তিনি নেশাগ্রস্ত হলেও আসলে একজন সমাজ সচেতন দার্শনিক। তিনি বিড়ালের যুক্তির মধ্যে সমাজের পরম সত্য খুঁজে পান।
২. বিড়াল (মার্জার): এটি কোনো সাধারণ প্রাণী নয়। বিড়াল এখানে সমাজের শোষিত, বঞ্চিত এবং ক্ষুধার্ত মানুষের প্রতিনিধি। তার কথাগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক, ধারালো এবং প্রতিবাদী।
৩. প্রসন্ন গোয়ালিনী: যদিও সে উপস্থিত নেই, তবে তার দুধ খাওয়ার মাধ্যমেই ঘটনার সূত্রপাত। সে এখানে সমাজের সম্পদশালী বা উৎপাদনকারী শ্রেণির প্রতীক।
🟢 ৭. অলঙ্কার ও সাহিত্যশৈলী
বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রবন্ধে অত্যন্ত নিপুণভাবে বক্রোক্তি (Satire) এবং রূপক (Allegory) ব্যবহার করেছেন।
- রূপক: বিড়ালের ক্ষুধাকে ক্ষুধার্ত দরিদ্র মানুষের প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়েছে।
- উপমা: "ক্ষুধার্তের কাছে ধর্মকথা শোনানো আর বিড়ালের কাছে নীতিবাক্য একই কথা।"
- শ্লেষ: সমাজের ওপরতলার মানুষদের 'সাধু' এবং গরিবদের 'চোর' বলাকে তীব্র বিদ্রূপ করা হয়েছে।
🟢 ৮. বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (২০টি MCQ)
- ১. ‘বিড়াল’ প্রবন্ধটি কোন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে?
(ক) লোকরহস্য (খ) কমলাকান্তের দপ্তর (গ) বিবিধ প্রবন্ধ (ঘ) সাম্য
উঃ (খ) কমলাকান্তের দপ্তর - ২. কমলাকান্ত কিসের নেশায় বুঁদ হয়েছিলেন?
(ক) গাঁজা (খ) ভাঙ (গ) আফিম (ঘ) মদ
উঃ (গ) আফিম - ৩. কমলাকান্ত কোন যুদ্ধের কথা ভাবছিলেন?
(ক) পলাশীর যুদ্ধ (খ) ওয়াটারলুর যুদ্ধ (গ) পানিপথের যুদ্ধ (ঘ) বক্সারের যুদ্ধ
উঃ (খ) ওয়াটারলুর যুদ্ধ - ৪. বিড়াল কার জন্য রাখা দুধ খেয়ে ফেলেছিল?
(ক) বঙ্কিমচন্দ্র (খ) প্রসন্ন গোয়ালিনী (গ) কমলাকান্ত (ঘ) নসীরাম
উঃ (গ) কমলাকান্ত - ৫. বিড়ালের মতে, 'অধৰ্ম' আসলে কার?
(ক) চোরের (খ) কৃপণ ধনীর (গ) বিড়ালের (ঘ) পুলিশের
উঃ (খ) কৃপণ ধনীর - ৬. "তৈলযুক্ত মাথায় তৈল দেওয়া" কাদের স্বভাব?
(ক) পশুর (খ) পক্ষীর (গ) মনুষ্যজাতির (ঘ) বিড়ালের
উঃ (গ) মনুষ্যজাতির - ৭. কমলাকান্ত বিড়ালকে মারার জন্য কী হাতে নিয়েছিলেন?
(ক) ছড়ি (খ) ভাঙা যষ্টি (গ) তলোয়ার (ঘ) ঢিল
উঃ (খ) ভাঙা যষ্টি - ৮. বিড়ালটি নিজেকে কী হিসেবে দাবি করেছে?
(ক) চোর (খ) সমাজ সংস্কারক (গ) দার্শনিক (ঘ) দুঃখী প্রাণী
উঃ (খ) সমাজ সংস্কারক - ৯. "চোর যে চুরি করে, সে কি সাধ করিয়া করে?" - উক্তিটি কার?
(ক) কমলাকান্ত (খ) বিড়াল (গ) লেখক (ঘ) প্রসন্ন
উঃ (খ) বিড়াল - ১০. বিড়াল কমলাকান্তকে কোন পাঠ দেওয়ার কথা বলেছে?
(ক) নীতি পাঠ (খ) ক্ষুৎপিপাসার পাঠ (গ) আফিমের পাঠ (ঘ) যুদ্ধের পাঠ
উঃ (খ) ক্ষুৎপিপাসার পাঠ - ১১. ‘মার্জার’ শব্দের অর্থ কী?
(ক) ইঁদুর (খ) কুকুর (গ) বিড়াল (ঘ) বাঘ
উঃ (গ) বিড়াল - ১২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
(ক) ১৮৩৮ (খ) ১৮২৪ (গ) ১৮৫০ (ঘ) ১৮৬১
উঃ (ক) ১৮৩৮ - ১৩. বিড়ালের মতে চোরকে সাজা দেওয়ার আগে কাকে সাজা দেওয়া উচিত?
(ক) বিচারককে (খ) অভাবী চোরকে (গ) কৃপণ ধনীদের (ঘ) কমলাকান্তকে
উঃ (গ) কৃপণ ধনীদের - ১৪. কমলাকান্তের মতে বিড়ালটি কেমন ছিল?
(ক) খুব ভীতু (খ) অসামান্য পণ্ডিত (গ) হিংস্র (ঘ) ক্ষুধার্ত
উঃ (খ) অসামান্য পণ্ডিত - ১৫. বিড়াল কার বাড়ি থেকে আসছিল?
(ক) কমলাকান্তের (খ) প্রসন্ন গোয়ালিনীর (গ) জমিদারের (ঘ) নসীরামের
উঃ (খ) প্রসন্ন গোয়ালিনীর - ১৬. "বিড়াল" প্রবন্ধে কোনটির প্রতি কটাক্ষ করা হয়েছে?
(ক) পশুপালন (খ) ব্রিটিশ শাসন (গ) পুঁজিবাদী সমাজ (ঘ) শিক্ষার অভাব
উঃ (গ) পুঁজিবাদী সমাজ - ১৭. বিড়ালের ভাষণে কিসের সুর ধ্বনিত হয়েছে?
(ক) করুণা (খ) সাম্যবাদ (গ) ভক্তি (ঘ) ঘৃণা
উঃ (খ) সাম্যবাদ - ১৮. বঙ্কিমচন্দ্রকে কী উপাধি দেওয়া হয়েছে?
(ক) কবিগুরু (খ) বিশ্বকবি (গ) সাহিত্য সম্রাট (ঘ) বিদ্রোহী কবি
উঃ (গ) সাহিত্য সম্রাট - ১৯. কমলাকান্ত শেষ পর্যন্ত বিড়ালকে কী খেতে দিতে চাইলেন?
(ক) আরও দুধ (খ) সন্দেশ (গ) আফিম (ঘ) মাছ
উঃ (গ) আফিম - ২০. প্রবন্ধের শেষে কমলাকান্তের কী পরিবর্তন হয়?
(ক) তিনি রাগ করেন (খ) তিনি জ্ঞানালোক লাভ করেন (গ) তিনি ঘুমিয়ে পড়েন (ঘ) তিনি বিড়ালকে মারেন
উঃ (খ) তিনি জ্ঞানালোক লাভ করেন
🟢 ৯. এক নজরে রিভিশন (One-Line Revision)
- ✅ 'বিড়াল' বঙ্কিমচন্দ্রের 'কমলাকান্তের দপ্তর' থেকে সংগৃহীত।
- ✅ এটি একটি সামাজিক ও রূপকধর্মী রম্যরচনা।
- ✅ গল্পের মূল দ্বন্দ্ব শুরু হয় কমলাকান্তের দুধ বিড়ালে খেয়ে ফেলাকে কেন্দ্র করে।
- ✅ বিড়াল এখানে বঞ্চিত ও দরিদ্র সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে কথা বলে।
- ✅ প্রবন্ধে ধনীদের কৃপণতা ও সামাজিক অবিচারের সমালোচনা করা হয়েছে।
- ✅ শেষ পর্যন্ত বিড়ালের যুক্তিবাদী দর্শনের কাছে কমলাকান্ত পরাজিত হন।
Study Notes PDF
Download this article for offline study
Social Platforms